ডেঙ্গুর চাপে ভিক্টোরিয়া
হাসপাতালে ঠাঁই বারান্দা-মেঝেতে, সেপ্টেম্বরে ভর্তি ১৯৩
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল
(ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায়
জায়গা হচ্ছে না অনেক রোগীর। ফলে কেউ বারান্দায়, আবার কেউ
ওয়ার্ডের মেঝেতে থেকেই নিচ্ছেন চিকিৎসা।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর)
হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতে অন্তত ১০ জন রোগীকে চিকিৎসাধীন
অবস্থায় দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, বর্তমানে ২৩ জনের বেশি ডেঙ্গু
রোগী ভর্তি রয়েছেন।
বন্দর কুড়িপাড়া এলাকার
বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম (৩১) স্ত্রীকে সন্তান প্রসব করাতে হাসপাতালে এসেছিলেন।
কিন্তু হাসপাতালে থাকতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তিনি। গত তিনদিন ধরে ডেঙ্গু
ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন আজহারুল।
একইভাবে দেওভোগ মাদ্রাসা
এলাকার মশিউর রহমানও তিনদিন ধরে ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডে
শয্যা না থাকায় বারান্দায় মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। এতে গরমসহ নানা অসুবিধা হলেও
চিকিৎসার জন্য এভাবেই থাকতে হচ্ছে।
দায়িত্ব পালনকারী একাধিক
নার্স জানান, প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। কয়েকজন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নেওয়ার পর
তাদের জায়গায় আবার নতুন রোগী আসছেন। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাধ্য
হয়ে বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর
আগে আগস্টে ১১৯ এবং জুলাইয়ে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত
হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭৬ জন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক
নাজমুল হাসান বিপুল বলেন,
রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শয্যার সংকট তৈরি হয়েছে। জায়গা সংকট
থাকলেও গুরুতর রোগীদের বারান্দা ও মেঝেতে স্থান করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গু বৃদ্ধির কারণ
সম্পর্কে তিনি বলেন,
কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট মৌসুমের বাইরেও ডেঙ্গু দেখা যাচ্ছে।
মশারি ব্যবহারে অনীহা এবং জনসচেতনতার ঘাটতিকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ
করেন। আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ানোর পর অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণের ঝুঁকি
তৈরি হয় বলেও জানান তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন
কার্যালয়ের হিসাবে,
গত ২৪ ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জে আরও ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার
৩৮৭ জন। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৯৮।
অর্থাৎ, গত বছরের
মোট আক্রান্তের তুলনায় মাত্র ১১ জন কম রোগী শনাক্ত হয়েছেন চলতি বছরের প্রথম নয়
মাসেই।
সরকারি হিসাবে চলতি বছর
নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। তবে জেলার কয়েকজন বাসিন্দা ঢাকার
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নারায়ণগঞ্জের বাইরে তাদের মৃত্যু হওয়ায়
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে এসব মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র
জানিয়েছে।
গত ২৮ আগস্ট রূপগঞ্জ উপজেলা
ভূমি অফিসের চেইনম্যান আবু ছিদ্দিক (৫৮) ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে মারা
যান বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পরিবার নিয়ে তিনি বন্দর উপজেলায় বসবাস
করতেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি
করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা চৌধুরীপাড়া এলাকায় আশা বেগম নামে এক
গৃহবধূর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু
আক্রান্ত হয়ে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর অবস্থার
অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।
ডেঙ্গুর বিস্তারের মধ্যে
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ মোস্তফা আলীও আক্রান্ত হয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
নাসিকের আরেক মেডিকেল অফিসার
ডা. নাফিয়া ইসলাম জানান,
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি এলাকায় নিয়মিত মশক নিধন, ওষুধ প্রয়োগ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায়
অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা.
সাখাওয়াত হোসেন বলেন,
সারাদেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে, যার
প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতে। ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল ১০০ শয্যার হওয়ায় অতিরিক্ত
রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে শয্যা সংকটের মধ্যেও রোগীদের
চিকিৎসা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ
মানুষকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মশাবাহিত এ রোগ প্রতিরোধে
ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।
দ্যা প্রেস নিউজ/এফজে
মন্তব্য করুন