নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ১০০ শয্যার নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের এক্স-রে সেবা প্রায় আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। বিভাগের একমাত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মারা যাওয়ার পর পদটি শূন্য হলেও সেখানে নতুন জনবল পদায়ন না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষা।
ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা অসংখ্য রোগী হাসপাতালের ভেতরে এক্স-রে
করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তাদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে
পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ
ব্যয়ের পাশাপাশি সময় ও ভোগান্তিও বাড়ছে।
বুধবার ( ৭ অক্টোবর ) সরেজমিনে হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগের সামনে গিয়ে
দেখা যায়, দরজায় ঝোলানো রয়েছে—‘এক্স-রে পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে’ লেখা একটি নোটিশ।
তবে হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার এই সময় ইতোমধ্যে
প্রায় আট মাসে গড়িয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এক্স-রে বিভাগের মেডিকেল
টেকনোলজিস্ট মো. আলী আকবর খান মারা যান। এরপর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। তার মৃত্যুর
পর নতুন কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়ন না হওয়ায় এক্স-রে বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে
যায়।
এক্স-রে সেবা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম
আয়ের রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকলেও এখন একই
পরীক্ষা করাতে তাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
হাটুর প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করাতে হাসপাতালে
এসেছিলেন সজল হোসেন কিন্তু এক্স-রে বিভাগ বন্ধ থাকায় তাকে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে
হয়।
সজল হোসেন বলেন, হাসপাতালে এক্স-রে করলে প্রায় ২০০ টাকা খরচ হতো। কিন্তু
বাইরে গিয়ে একই পরীক্ষার জন্য তাকে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা
নিতে এসেও যদি পরীক্ষা বাইরে করাতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার
সুবিধা কোথায় এমন প্রশ্ন তার।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের
বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। পাশাপাশি
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
সে হিসাবে মাসে প্রায় ৬০ হাজার বহির্বিভাগের রোগী এবং প্রায় ৩ হাজার
৬০০ ভর্তি রোগী এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে
যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়ছে পুরো
চিকিৎসাব্যবস্থায়।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, শুধু এক্স-রে নয়, বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গুসহ নানা
ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও তাদের হাসপাতালের বাইরে যেতে বলা হয়। এতে সরকারি হাসপাতালের
কম খরচে চিকিৎসা নেওয়ার সুবিধা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।
এর মধ্যে গত ১৪ জুন নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ওই সময় তিনি হাসপাতালের নবনির্মিত আইসিইউ সেবার উদ্বোধন
করেন।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ
করে জনবল সংকট দূর করা, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং হাসপাতালের পরিবেশ ও নিরাপত্তা
ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেন তিনি।
তবে এরপরও এক্স-রে বিভাগ চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে হাসপাতাল
সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডাঃ নাজমুল হোসাইন বিপুল বলেন, এক্স-রে বিভাগ চালুর জন্য নতুন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো
থেকে সপ্তাহে দুই দিন একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এনে এক্স-রে সেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা
করা হচ্ছে। তবে উপজেলা পর্যায়েও জনবল সংকট থাকায় সেটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে রোগীদের প্রশ্ন? কবে নাগাদ এক্স-রে বিভাগটি আবার চালু হবে এবং
সরকারি হাসপাতালে কম খরচে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার সুযোগ ফিরবে? সংশ্লিষ্টদের আশ্বাসের
পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন